উপনিবেশোত্তর যুগে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের রূপান্তরশীল গতিশীলতা: দৃঢ় গণতন্ত্রের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশীদারিত্ব নির্মাণ
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
সারসংক্ষেপ
এই প্রবন্ধে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সমাজে পরিবর্তিত মানদণ্ড এবং আধুনিক যুদ্ধের জটিলতা—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে অসামরিক-সামরিক সম্পর্কের চলমান রূপান্তর বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। চার্লস টিলি ও মাইকেল ম্যান-এর মত তাত্ত্বিকদের বিশ্লেষণ অনুসরণ করে এখানে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, কীভাবে উপনিবেশিক উত্তরাধিকার, বৈশ্বিকায়ন এবং সাম্প্রতিক জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্র গঠনের ধারা ও বেসামরিক-সামরিক উত্তেজনাকে প্রভাবিত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বেসামরিক তত্ত্বাবধান, সামরিক পেশাদারিত্ব, এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা—এই তিনটি মৌলিক বিষয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আজকের নিরাপত্তা বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল এবং পারস্পরিক নির্ভরশীল, যেখানে স্পষ্ট সীমারেখা টানা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রবন্ধে রাজনৈতিক মেরুকরণ, আস্থার ঘাটতি, অস্পষ্ট অসামরিক-সামরিক ভূমিকাবন্টন এবং অন্তর্ভুক্তির অভাবকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও, একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক অসামরিক-সামরিক সম্পর্ক গঠনের জন্য কিছু প্রাসঙ্গিক নীতিগত সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে।
যদিও এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত নয়, তথাপি এই বিশ্লেষণ মূলত তথ্য ও অভিজ্ঞতা নির্ভর, যার মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীর নিরাপত্তা ভাবনার ক্ষেত্রে একটি অর্থপূর্ণ সংলাপ শুরু করা যেতে পারে।
প্রেক্ষাপট
সামরিক বাহিনী ও আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার
ঔপনিবেশিক শাসন এশিয়া ও আফ্রিকার সমাজ ও সংস্কৃতিকে এক গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। উপনিবেশিক শক্তিগুলো যেভাবে সীমান্ত টেনেছে, তা ছিল রাজনৈতিক সুবিধা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার একটি উপায়—তারা ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়কে একই রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে জোর করে একত্রিত করে তৈরি করেছিল কৃত্রিম জাতি-রাষ্ট্র। এর ফলে সৃষ্টি হয় এক শ্রেণিবিন্যস্ত সমাজ, যেখানে কিছু গোষ্ঠী পেত বিশেষ সুবিধা—ভাষা, শিক্ষা ও প্রশাসনিক প্রাধান্যের মাধ্যমে, আর বাকি অংশ পড়ে থাকত প্রান্তে।
‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ কৌশলের সফল প্রয়োগ ছিল এটিই—ভাগ করে শাসন করা। যাদের অনুগত্য দরকার, তাদেরকে দিয়েছে সুযোগ; আর বাকিদের পিছিয়ে রেখে তৈরি করেছে অবিশ্বাস ও বিদ্বেষের দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো। এই বৈষম্যপূর্ণ উত্তরাধিকার আজও টিকে আছে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও সামরিক অভ্যুত্থানের বীজ হিসেবে কাজ করে। স্বাধীনতা আন্দোলনগুলো যে কাঠামোয় সংগঠিত হয়েছিল, সেগুলোর ধরনও এই প্রবণতাগুলোকে প্রভাবিত করেছে।
বিশেষ করে এশিয়ায়, উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ে সামরিক-অসামরিক সম্পর্ক গঠনে ঔপনিবেশিক প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। কারণ, উপনিবেশবাদীরা কখনোই জাতীয়ভাবে অনুপ্রাণিত, পেশাদার সামরিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়নি। বরং তাদের দৃষ্টিতে সেনাবাহিনী ছিল শুধুই শাসনের এক যন্ত্র—যে বাহিনীকে শুধু আদেশ মানতে হবে, রাষ্ট্রের হয়ে নয় বরং শাসকের হয়ে কাজ করতে হবে।
ফরাসি ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা কখনো সরাসরি সামরিক কর্তৃত্ব জোরদার না করলেও পরোক্ষভাবে এমন এক কাঠামো তৈরি করে গেছে—যা সামরিক আধিপত্যের পথকে প্রশস্ত করেছে। এর ফলে অনেক দেশেই গণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধানে থাকা সামরিক-অসামরিক সম্পর্ক কখনো পূর্ণতা পায়নি।
ফলাফল? স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেখা দিলেই সেনাবাহিনীকে ডাকা হয়েছে। কিন্তু আমরা ভুলে যাই—সেনাবাহিনী মূলত যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের ভাষা বল, অস্ত্র ও আদেশ; সহানুভূতি বা সমঝোতার উপর গড়ে ওঠেনি তাদের কাঠামো। তাই যখন রাজনৈতিক বা অসামরিক বিরোধে তাদের জড়ানো হয়, তখন পরিস্থিতি প্রায়শই আরও কঠিন ও সামরিকীকৃত হয়ে পড়ে। এতে গণতন্ত্র যেমন দুর্বল হয়, তেমনি সমাজে আস্থা ও স্থিতিশীলতার অভাবও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে।
পরিবর্তনশীল বাস্তবতা ও ভেঙে পড়া নীতি কাঠামো
বেসামরিক কর্তৃত্ব জাতীয় নিরাপত্তা নীতিকে নেতৃত্বের নির্দেশনায় পরিচালিত করতে সাহায্য করে এবং সামরিক পক্ষপাত কমাতে সহায়তা করে। অপরদিকে, পেশাগত সামরিক নৈতিকতা নিশ্চিত করে যে সেনা সদস্যরা বৈধ নির্দেশনার প্রতি আনুগত্য বজায় রাখে এবং জবাবদিহিতা রক্ষা করে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাধারণ জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয়, কারণ এতে স্পষ্ট হয় যে সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক স্বার্থ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়।
নতুন চিন্তার প্রয়োজনীয়তা
আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার ধারায় পরিবর্তন আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে আস্থা, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং বেসামরিক তদারকি নিশ্চিত করাটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো—সামরিক খাতে এমন নতুন সংগঠনগত ও নেতৃত্বমূলক পন্থা গড়ে তোলা, যেখানে বেসামরিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলো প্রকৃত অর্থেই অন্তর্ভুক্ত হয়।
সমাজিক মানদণ্ডের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে, এখন সময় এসেছে এটি অন্বেষণের—কিভাবে একটি রাষ্ট্র এমন শক্তিশালী সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, যা কৌশলগত কার্যকারিতাকে আরও উন্নত করে। আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে—কোন নীতিমালা আরও জোরদার করা দরকার, কোনগুলো সময়ের সাথে পরিবর্তিত হওয়া উচিত, এবং সরকার ও সামরিক বাহিনীকে কী ধরনের নীতি ও কাঠামো গ্রহণ করতে হবে, যাতে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
সম্ভাব্য নীতিগত পদক্ষেপসমূহ
পররাষ্ট্র নীতি এবং প্রতিরক্ষা নীতি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত; তাই উভয়কেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, জাতীয় ন্যারেটিভ কে প্রতিফলিত করে, এবং দেশের সাংবিধানিক কাঠামো ও সামগ্রিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অনুসরণ করে প্রস্তুত করা উচিত।
-
অসামরিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই জ্ঞান ও তথ্য বিনিময়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা সমন্বিত উদ্দেশ্যগুলোকে সমর্থন করে এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতি রাখে। এই পদ্ধতিতে জাতীয় বিবেচনাগুলোকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যাতে টেকসই নীতিমালা স্থায়িত্ব পায়।
-
রাষ্ট্র ও তার সামরিক বাহিনীর মধ্যে মৌলিক সম্পর্ক নির্ধারণে একটি সুস্পষ্ট আইনি, সাংবিধানিক এবং নীতিমালা কাঠামো থাকা অপরিহার্য।
-
সংসদকে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে, জাতীয় কৌশল উন্নয়নে প্রভাব বিস্তার করতে হবে, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতিমালার সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, বাজেট অনুমোদন করতে হবে এবং ব্যয়ের তদারকি করতে হবে।
সামরিক বাহিনী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে, সরকার পরিচালিত শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং এর কার্যক্রম তদারকি করা হবে।
দক্ষ ও প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনী, যা বেসামরিক কর্তৃপক্ষ দ্বারা সম্মানিত ও অর্থায়িত, বেসামরিক তদারকির নীতি স্বীকার করে এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতা বজায় রাখে।
একটি শক্তিশালী বেসামরিক সমাজের উপস্থিতি জরুরি, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বোঝে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ও মিশনের ব্যাপক সম্মতি গড়ে তোলে।
রাষ্ট্রের নির্বাহী শাখার আওতায়, সশস্ত্র বাহিনী রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে জবাবদিহি প্রদান করে, আর সেই নেতৃত্ব পরবর্তীতে সংসদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে।
-
অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের মতো সশস্ত্র বাহিনীও সংসদীয় তদারকির আওতায় থাকবে।
-
অন্য রাষ্ট্রীয় কার্যাবলীর মতো, তাদের কার্যক্রমও বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতাভুক্ত।
-
এছাড়াও, তারা রাষ্ট্রীয় অডিট অফিসের ব্যাপক ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার সম্মুখীন হবে, যা সশস্ত্র বাহিনীর অর্থ পরিচালনার কার্যকারিতা নিরীক্ষণ করে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রদান করবে ।
-
মিডিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের প্রতি জনসাধারণের ধারণাকে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার, যা একটি মজবুত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যাবশ্যক। বেসামরিক ও সামরিক অংশীদারিত্বের সঠিক সমন্বয় রক্ষা করে, মিডিয়া এমন একটি ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে পারে যা নাগরিকদের একত্রিত করে ও শক্তিশালী করে, এবং গণতন্ত্রকে আরো বলিষ্ঠ ও স্থিতিশীল করে।
সামরিক ও নিরাপত্তা খাতের অংশীদারগণদের মধ্যে একটি যুক্তিসঙ্গত ও সুসংগঠিত বেসরকারি অংশ থাকা আবশ্যক, যা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতিসংক্রান্ত জনসংলাপে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে এবং বিকল্প মতামত ও প্রস্তাবনা প্রদান করে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করবে।
দায়িত্ব অস্বীকৃতি (DISCLAIMER):
লেখক সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ নাও হতে পারেন, তবে এই বিশ্লেষণ বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকেই গঠিত। এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো—সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি, মতবিনিময় উৎসাহিত করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়াস।
লেখক পরিচিতি
লেখক: আহমদ এম দিপু
একজন স্বাধীন লেখক, যিনি বাংলাদেশের গতিশীল ঘটনাবলীর উপর বিশেষ মনোযোগ সহকারে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অন্বেষণে নিবেদিত। তার কাজ সমাজের জন্য একটি অর্থপূর্ণ অবদান রাখার আকাঙ্ক্ষা দ্বারা চালিত। শিক্ষাগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ বুননের সাথে, তিনি নিরপেক্ষ, স্বাধীন গবেষণা পরিচালনা করেন যা বাংলাদেশের চলমান রূপান্তর ও পরিবর্তনগুলোকে আলোকিত করে, যার লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সম্পর্কে সচেতনতা এবং সংলাপকে অনুপ্রাণিত করা।
Translated From:
"Exploring the Transformative Dynamics of Civil-Military Relations in the Post-Colonial Era: Building Inclusive Partnerships for a Resilient Democracy "
Author : Ahmad M Dipu
https://www.linkedin.com/in/ahmaddipu/


