বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন, ২০২৫

 


উপনিবেশোত্তর যুগে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের রূপান্তরশীল গতিশীলতা:  দৃঢ় গণতন্ত্রের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশীদারিত্ব নির্মাণ


১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫


সারসংক্ষেপ

ই প্রবন্ধে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সমাজে পরিবর্তিত মানদণ্ড এবং আধুনিক যুদ্ধের জটিলতা—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে অসামরিক-সামরিক সম্পর্কের চলমান রূপান্তর বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। চার্লস টিলি ও মাইকেল ম্যান-এর মত তাত্ত্বিকদের বিশ্লেষণ অনুসরণ করে এখানে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, কীভাবে উপনিবেশিক উত্তরাধিকার, বৈশ্বিকায়ন এবং সাম্প্রতিক জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্র গঠনের ধারা ও বেসামরিক-সামরিক উত্তেজনাকে প্রভাবিত করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে বেসামরিক তত্ত্বাবধান, সামরিক পেশাদারিত্ব, এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা—এই তিনটি মৌলিক বিষয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আজকের নিরাপত্তা বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল এবং পারস্পরিক নির্ভরশীল, যেখানে স্পষ্ট সীমারেখা টানা কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রবন্ধে রাজনৈতিক মেরুকরণ, আস্থার ঘাটতি, অস্পষ্ট অসামরিক-সামরিক ভূমিকাবন্টন এবং অন্তর্ভুক্তির অভাবকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও, একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক অসামরিক-সামরিক সম্পর্ক গঠনের জন্য কিছু প্রাসঙ্গিক নীতিগত সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে।

যদিও এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত নয়, তথাপি এই বিশ্লেষণ মূলত তথ্য ও অভিজ্ঞতা নির্ভর, যার মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীর নিরাপত্তা ভাবনার ক্ষেত্রে একটি অর্থপূর্ণ সংলাপ শুরু করা যেতে পারে।



প্রেক্ষাপট

চার্লস টিলি এবং মাইকেল ম্যান-এর মত সমাজতাত্ত্বিকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে রাষ্ট্র গঠনের পেছনে সামরিক শক্তির একটি মৌলিক ভূমিকা ছিল, যা অনেক সময় জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ে বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে কিছু ক্ষেত্রে এই সংঘাত প্রশমিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এক্ষেত্রে নতুন রকমের জটিলতা তৈরি হয়েছে—বিশেষ করে জাতি-রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে।

এই নতুন পরিস্থিতির ফলাফল হিসেবে এক ধরনের 'নতুন জাতীয়তাবাদ' মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, যা মূলত স্থানীয় ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং বিশ্বব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী স্থানীয় পরিচয় তৈরি হয়েছে, যা অনেক সময় জাতীয় সংহতির সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। একইসঙ্গে, সমাজে মতপার্থক্য এবং বিভক্তির রেখাগুলো আগের চেয়ে আরও গভীর হয়েছে।

আজ আমরা দেখছি, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমাত্রিক সংঘাত পুনরায় মাথাচাড়া দিচ্ছে। এসব নতুন ধরনের যুদ্ধ ও সংঘাত মোকাবেলায় কেবল সামরিক কৌশল যথেষ্ট নয়—একটি সমন্বিত ও বহুমুখী কৌশল গড়ে তোলা দরকার, যেখানে কূটনীতি, উন্নয়ন, সুশাসন ও প্রতিরক্ষা—সব একসাথে কাজ করবে। এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রে থাকবে অসামরিক উদ্যোগ এবং সামরিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে বাস্তবসম্মত সমন্বয়।

এছাড়াও, সামরিক প্রযুক্তি এবং নতুন যুদ্ধক্ষেত্র যেমন—সাইবার জগত, মহাকাশ বা তথ্যযুদ্ধ—এইগুলো এখন রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। এই পরিবর্তনগুলো সামরিক ও অসামরিক ভূমিকাগুলোর সীমারেখা অনেকটাই ধূসর করে ফেলেছে। ফলে রাষ্ট্রের ভেতরে সরকার, সেনাবাহিনী ও সমাজের মধ্যে এক ধরনের স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল এবং বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।


সামরিক বাহিনী ও আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র

সামরিক বাহিনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রকে বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। সেই চিন্তা থেকেই অনেক দেশ শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে—একধরনের প্রতিরোধমূলক বল, যা সম্ভাব্য শত্রুর জন্য একটি নিরুৎসাহের বার্তা বহন করে। তবে সময় বদলেছে। বিশ্বায়ন, আন্তঃনির্ভরতা, এবং পারস্পরিক সংযোগ এতটাই বেড়েছে যে, এখন আর রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যুদ্ধ আগের মতো সাধারণ ঘটনা নয়।

ফলে এখন নিরাপত্তার সংজ্ঞাও বদলে গেছে। আগের মতো শুধু সীমান্ত সুরক্ষাই যথেষ্ট নয়—আজকের দিনে "মানবিক নিরাপত্তা" অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। যেমন: খাদ্য, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রযুক্তি বা পরিচয়-নির্ভর সংকট। এসব বিষয় সামরিক বাহিনীর একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই, অসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই সমন্বয় গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

একইভাবে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধু সামরিক শক্তি কাজে আসে না। প্রয়োজন কৌশল, গোয়েন্দা সমন্বয়, অর্থনৈতিক পদক্ষেপ এবং সামাজিক পুনর্বাসনের সমন্বিত প্রয়াস।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা ও অস্থিরতা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। প্রতিটি রাষ্ট্র ও অঞ্চলের স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা জাতীয় এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সামনে একধরনের দ্রুত অভিযোজনের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে, জাতির সংজ্ঞা এবং নিরাপত্তা-ভাবনার দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে গঠিত হওয়া দরকার, যা কেবল প্রতিরক্ষা নয়, উন্নয়ন ও কূটনীতির সঙ্গেও খাপ খায়।

জাতীয় নিরাপত্তা এখন আর কেবল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একক ইস্যু নয়—এটা এখন একাধিক শাখা ও মেধা-ক্ষেত্রের যৌথ কর্মক্ষেত্র। এই কারণে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা ও নীতিপর্যায়ে জোর বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, পুরনো ধাঁচের ভাবনার জায়গায় নতুন, উদ্ভাবনী ও বাস্তবভিত্তিক চিন্তা প্রয়োজন।

তবে বাস্তবতা এটাও বলছে যে, অনেক দেশের সামরিক দক্ষতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে—বিশেষ করে যেখানে অসামরিক তদারকি কাঠামো দুর্বল। সেখানে সমস্যাগুলো একাধিক: দক্ষ অসামরিক নেতৃত্বের অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কিংবা কোথাও কোথাও সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত স্বায়ত্তশাসন।

আন্তর্জাতিক আইন বরাবরই চেয়েছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ব্যক্তি অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে। কিন্তু যখন কোনো রাষ্ট্র নিজের জনগণের উপরই চরম নিপীড়ন চালায়, তখন সেই ভারসাম্য ভেঙে যায়—এবং তখন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যক্তির অধিকারকেই অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে।

তারপরও, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে—একটি শক্তিশালী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সামরিক বাহিনী আজও নিরাপত্তা এবং প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অনিবার্য। এটি শুধুই প্রতিরক্ষা নয়; এটি একধরনের কৌশলগত ভারসাম্য, যা আঞ্চলিক শান্তি এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখে।


ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার

ঔপনিবেশিক শাসন এশিয়া ও আফ্রিকার সমাজ ও সংস্কৃতিকে এক গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। উপনিবেশিক শক্তিগুলো যেভাবে সীমান্ত টেনেছে, তা ছিল রাজনৈতিক সুবিধা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার একটি উপায়—তারা ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়কে একই রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে জোর করে একত্রিত করে তৈরি করেছিল কৃত্রিম জাতি-রাষ্ট্র। এর ফলে সৃষ্টি হয় এক শ্রেণিবিন্যস্ত সমাজ, যেখানে কিছু গোষ্ঠী পেত বিশেষ সুবিধা—ভাষা, শিক্ষা ও প্রশাসনিক প্রাধান্যের মাধ্যমে, আর বাকি অংশ পড়ে থাকত প্রান্তে।

‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ কৌশলের সফল প্রয়োগ ছিল এটিই—ভাগ করে শাসন করা। যাদের অনুগত্য দরকার, তাদেরকে দিয়েছে সুযোগ; আর বাকিদের পিছিয়ে রেখে তৈরি করেছে অবিশ্বাস ও বিদ্বেষের দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো। এই বৈষম্যপূর্ণ উত্তরাধিকার আজও টিকে আছে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও সামরিক অভ্যুত্থানের বীজ হিসেবে কাজ করে। স্বাধীনতা আন্দোলনগুলো যে কাঠামোয় সংগঠিত হয়েছিল, সেগুলোর ধরনও এই প্রবণতাগুলোকে প্রভাবিত করেছে।

বিশেষ করে এশিয়ায়, উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ে সামরিক-অসামরিক সম্পর্ক গঠনে ঔপনিবেশিক প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। কারণ, উপনিবেশবাদীরা কখনোই জাতীয়ভাবে অনুপ্রাণিত, পেশাদার সামরিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়নি। বরং তাদের দৃষ্টিতে সেনাবাহিনী ছিল শুধুই শাসনের এক যন্ত্র—যে বাহিনীকে শুধু আদেশ মানতে হবে, রাষ্ট্রের হয়ে নয় বরং শাসকের হয়ে কাজ করতে হবে।

ফরাসি ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা কখনো সরাসরি সামরিক কর্তৃত্ব জোরদার না করলেও পরোক্ষভাবে এমন এক কাঠামো তৈরি করে গেছে—যা সামরিক আধিপত্যের পথকে প্রশস্ত করেছে। এর ফলে অনেক দেশেই গণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধানে থাকা সামরিক-অসামরিক সম্পর্ক কখনো পূর্ণতা পায়নি।

ফলাফল? স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেখা দিলেই সেনাবাহিনীকে ডাকা হয়েছে। কিন্তু আমরা ভুলে যাই—সেনাবাহিনী মূলত যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের ভাষা বল, অস্ত্র ও আদেশ; সহানুভূতি বা সমঝোতার উপর গড়ে ওঠেনি তাদের কাঠামো। তাই যখন রাজনৈতিক বা অসামরিক বিরোধে তাদের জড়ানো হয়, তখন পরিস্থিতি প্রায়শই আরও কঠিন ও সামরিকীকৃত হয়ে পড়ে। এতে গণতন্ত্র যেমন দুর্বল হয়, তেমনি সমাজে আস্থা ও স্থিতিশীলতার অভাবও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে।


পরিবর্তনশীল বাস্তবতা ও ভেঙে পড়া নীতি কাঠামো

সামরিক-বেসামরিক নীতিমালার ভারসাম্যহীনতা উদীয়মান নীতিগত ও নিরাপত্তাজনিত জটিলতায় জাতিগুলোকে অপ্রস্তুত রাখছে। সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় সামরিক সংকট ব্যবস্থাপনার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে: (১) সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক কর্তৃত্ব এবং (২) পেশাগত সামরিক নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা, যার মধ্যে রাজনৈতিক পক্ষপাতহীনতা অন্যতম।

বেসামরিক কর্তৃত্ব জাতীয় নিরাপত্তা নীতিকে নেতৃত্বের নির্দেশনায় পরিচালিত করতে সাহায্য করে এবং সামরিক পক্ষপাত কমাতে সহায়তা করে। অপরদিকে, পেশাগত সামরিক নৈতিকতা নিশ্চিত করে যে সেনা সদস্যরা বৈধ নির্দেশনার প্রতি আনুগত্য বজায় রাখে এবং জবাবদিহিতা রক্ষা করে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাধারণ জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয়, কারণ এতে স্পষ্ট হয় যে সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক স্বার্থ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়।

তবে, এই নীতিমালাগুলো দ্রুতগতিতে অবক্ষয়ের পথে, যা জাতীয় নিরাপত্তা মহলে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। গবেষক এবং নীতিনির্ধারক—উভয়ই বেসামরিক কর্তৃত্বের দুর্বলতা, সামরিক রাজনীতিকরণ, দলীয় পক্ষপাত এবং জনবল নিয়োগসংক্রান্ত সমস্যাবলীর প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, এ ধরনের অবক্ষয় গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে হ্রাস করে।
এছাড়া, একটি অস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি অতিরিক্ত সহনশীল পররাষ্ট্রনীতি ভবিষ্যতের সামরিক কার্যকারিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিবাচক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সময়ের দাবি।

পেশাদার নীতিমালা দুর্বল হচ্ছে কারণ রাজনৈতিক নেতারা সামরিক সদস্যদের আইনগত আদেশ উপেক্ষা করার জন্য উৎসাহ দিচ্ছেন, যা বাহিনীর অভ্যন্তরে সংহতি নষ্ট করে এবং সামগ্রিক প্রস্তুতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব পরিবর্তন একটি দেশের সামগ্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জাতীয় কৌশল নির্ধারণের ক্ষমতাকেও কমজোর করে, যেখানে সামরিক দৃষ্টিভঙ্গিকে জনগণের চেয়ে অযথা প্রাধান্য দেওয়া হয়।

অসামরিক নিয়ন্ত্রণ ও পেশাদার মানদণ্ডের অবনতি এমন সময় ঘটছে যখন যুদ্ধের প্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে, যার জন্য অসামরিক ও সামরিক নেতাদের মধ্যে আরও বেশি বিশ্বাস ও সহযোগিতা জরুরি। এই পরিস্থিতি দেশগুলোকে আধুনিক হুমকির মোকাবিলায় দুর্বল করে তুলছে এবং সামরিক-অসামরিক সম্পর্কের ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে তীব্র করছে।

বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো সামরিক ও অসামরিক লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সীমানা অস্পষ্ট করে দিয়েছে, যার ফলে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং দৃঢ় বিশ্বাস আবশ্যক। হান্টিংটনের প্রস্তাবিত ঐতিহ্যবাহী কর্মবিভাগ এখন আর যথেষ্ট নয়, কারণ আজকের বাস্তবতায় সামরিক পদক্ষেপ সরাসরি অসামরিক জীবনে প্রভাব ফেলে এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সামরিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে। দুঃখজনকভাবে, সামরিক বাহিনীর প্রতি সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক নেতাদের বিশ্বাস কমছে।

এই আস্থার অবক্ষয় সরকারকে ধারাবাহিক কৌশলগত উন্নয়নে সম্পৃক্ত থাকতে বাধাগ্রস্ত করছে, যা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার বাস্তবতা এখন কৌশলবিদদেরকে এমন সব দুর্বলতা বিবেচনায় নিতে বাধ্য করছে, যা সামরিক ও বেসামরিক উভয় সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে—যেমন মহাকাশ প্রযুক্তি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরতা।
ফলে, কৌশলসমূহের নিয়মিত মূল্যায়ন ও অভিযোজন অপরিহার্য হয়ে উঠবে—যেখানে সামরিক কার্যকারিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতিগুলোও সমান গুরুত্বে বিবেচনায় নিতে হবে।

এই ধারাবাহিক কৌশলগত প্রক্রিয়ার জন্য শক্তিশালী বেসামরিক-সামরিক সম্পর্ক অপরিহার্য। পারস্পরিক আস্থা ছাড়া ভুল চিহ্নিতকরণ ও তা সংশোধনের সক্ষমতা সম্ভব নয়—যা যুদ্ধের লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে বাধা সৃষ্টি করে।

নতুন চিন্তার প্রয়োজনীয়তা

আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার ধারায় পরিবর্তন আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে আস্থা, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং বেসামরিক তদারকি নিশ্চিত করাটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো—সামরিক খাতে এমন নতুন সংগঠনগত ও নেতৃত্বমূলক পন্থা গড়ে তোলা, যেখানে বেসামরিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলো প্রকৃত অর্থেই অন্তর্ভুক্ত হয়।

সমাজিক মানদণ্ডের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে, এখন সময় এসেছে এটি অন্বেষণের—কিভাবে একটি রাষ্ট্র এমন শক্তিশালী সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, যা কৌশলগত কার্যকারিতাকে আরও উন্নত করে। আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে—কোন নীতিমালা আরও জোরদার করা দরকার, কোনগুলো সময়ের সাথে পরিবর্তিত হওয়া উচিত, এবং সরকার ও সামরিক বাহিনীকে কী ধরনের নীতি ও কাঠামো গ্রহণ করতে হবে, যাতে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।


সম্ভাব্য নীতিগত পদক্ষেপসমূহ

  • পররাষ্ট্র নীতি এবং প্রতিরক্ষা নীতি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত; তাই উভয়কেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, জাতীয় ন্যারেটিভ  কে  প্রতিফলিত করে, এবং দেশের সাংবিধানিক কাঠামো ও সামগ্রিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অনুসরণ করে প্রস্তুত করা উচিত।

  • অসামরিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই জ্ঞান ও তথ্য বিনিময়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা সমন্বিত উদ্দেশ্যগুলোকে সমর্থন করে এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতি রাখে। এই পদ্ধতিতে জাতীয় বিবেচনাগুলোকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যাতে টেকসই নীতিমালা স্থায়িত্ব পায়। 

  • রাষ্ট্র ও তার সামরিক বাহিনীর মধ্যে মৌলিক সম্পর্ক নির্ধারণে একটি সুস্পষ্ট আইনি, সাংবিধানিক এবং নীতিমালা কাঠামো থাকা অপরিহার্য।

  • সংসদকে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে, জাতীয় কৌশল উন্নয়নে প্রভাব বিস্তার করতে হবে, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতিমালার সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, বাজেট অনুমোদন করতে হবে এবং ব্যয়ের তদারকি করতে হবে।

  • সামরিক বাহিনী  প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে, সরকার পরিচালিত শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং এর কার্যক্রম তদারকি করা হবে।

  • দক্ষ ও প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনী, যা বেসামরিক কর্তৃপক্ষ দ্বারা সম্মানিত ও অর্থায়িত, বেসামরিক তদারকির নীতি স্বীকার করে এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতা বজায় রাখে।

  • একটি শক্তিশালী বেসামরিক সমাজের উপস্থিতি জরুরি, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বোঝে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ও মিশনের ব্যাপক সম্মতি গড়ে তোলে।

  • রাষ্ট্রের নির্বাহী শাখার আওতায়, সশস্ত্র বাহিনী রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে জবাবদিহি প্রদান করে, আর সেই নেতৃত্ব পরবর্তীতে সংসদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে।

  • অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের মতো সশস্ত্র বাহিনীও সংসদীয় তদারকির আওতায় থাকবে।

  • অন্য রাষ্ট্রীয় কার্যাবলীর মতো, তাদের কার্যক্রমও বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতাভুক্ত।

  • এছাড়াও, তারা রাষ্ট্রীয় অডিট অফিসের ব্যাপক ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার সম্মুখীন হবে, যা সশস্ত্র বাহিনীর অর্থ পরিচালনার কার্যকারিতা নিরীক্ষণ করে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রদান করবে ।

  • মিডিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের প্রতি জনসাধারণের ধারণাকে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার, যা একটি মজবুত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যাবশ্যক। বেসামরিক ও সামরিক অংশীদারিত্বের সঠিক সমন্বয় রক্ষা করে, মিডিয়া এমন একটি ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে পারে যা নাগরিকদের একত্রিত করে ও শক্তিশালী করে, এবং গণতন্ত্রকে আরো বলিষ্ঠ ও স্থিতিশীল করে।

  • সামরিক ও নিরাপত্তা খাতের অংশীদারগণদের  মধ্যে একটি যুক্তিসঙ্গত ও সুসংগঠিত বেসরকারি অংশ থাকা আবশ্যক, যা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতিসংক্রান্ত জনসংলাপে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে এবং বিকল্প মতামত ও প্রস্তাবনা প্রদান করে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করবে।




দায়িত্ব অস্বীকৃতি (DISCLAIMER):


লেখক সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ নাও হতে পারেন, তবে এই বিশ্লেষণ বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকেই গঠিত। এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো—সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি, মতবিনিময় উৎসাহিত করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়াস।




লেখক পরিচিতি


লেখক: আহমদ এম দিপু

একজন স্বাধীন লেখক, যিনি বাংলাদেশের গতিশীল ঘটনাবলীর উপর বিশেষ মনোযোগ সহকারে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অন্বেষণে নিবেদিত। তার কাজ সমাজের জন্য একটি অর্থপূর্ণ অবদান রাখার আকাঙ্ক্ষা দ্বারা চালিত। শিক্ষাগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ বুননের সাথে, তিনি নিরপেক্ষ,  স্বাধীন গবেষণা পরিচালনা করেন যা বাংলাদেশের চলমান রূপান্তর ও পরিবর্তনগুলোকে আলোকিত করে, যার লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সম্পর্কে সচেতনতা এবং সংলাপকে অনুপ্রাণিত করা।


Translated From: 

"Exploring the Transformative Dynamics of Civil-Military Relations in the Post-Colonial Era: Building Inclusive Partnerships for a Resilient Democracy "

Author : Ahmad M Dipu


https://www.linkedin.com/in/ahmaddipu/



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  উপনিবেশোত্তর যুগে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের রূপান্তরশীল গতিশীলতা:  দৃঢ় গণতন্ত্রের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশীদারিত্ব নির্মাণ ১৯ ফেব্রুয়া...